রবির দৃষ্টিতে নদী-প্রকৃতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাবলীতে প্রকৃতি ও নদী অন্যমাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে নদীর একটি গুরুত্ব থেকেই যায়। রবীন্দ্রনাথের কবিতা গান, প্রবন্ধ ও গল্পে নদীর কথা উঠে আসে। এক জীবন্ত সত্তা হয়ে ধরা দিয়েছে। এক আত্মিক অনুষঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায়। “মাঝি” কবিতায় তাঁর লেখনী থেকে পাওয়া যায় –
আমার যেতে ইচ্ছে করে
নদীটির ওই পারে
যেথায় ধারে ধারে বাঁশের খোঁটায়
ডিঙি নৌকো বাঁধা সারে সারে।
নদীর সাথে জুড়ে-জড়িয়ে থেকেছে তাঁর শৈশব স্মৃতি। কলকাতার জোড়াসাঁকোতে শৈশব-কৈশর কাটে। এরপর পদ্মা নদীর পাড়ে শিলাইদহে তাঁর অভিজ্ঞতার বর্ণনা পাওয়া যায়। রবীন্দ্রনাথের মনন ও কাব্যচর্চায় তার প্রভাব আমরা দেখি। পদ্মার প্রকৃতি, স্রোতের টান, মনোরম পাড়ের দৃশ্য ,নদীর বুকে নৌকায় চড়ে বেড়ানোর দৃশ্যগুলি যেন দেখতে পাই। আমাদের কল্পনাকে সেই জগতে নিয়ে যায়। নদী ও জীবনদর্শন আমরা কবির কল্পনায় উপলব্ধি করি।
নদী শুধু প্রকৃতির অংশ নয়,নদী জীবনের প্রতীকও তাঁর কলমে । তাঁর লেখায়-আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু,পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার ঢালু তার পাড়ি।
আবার রবীন্দ্রনাথের “গীতাঞ্জলি”তে উল্লেখ পাই –
“আমি নদীর মতন বয়ে যাই, তোমার পায়ে এসে মেলাই আমার জলের মালা।”
রবীন্দ্রনাথের চোখে নদী প্রেমের ও একাত্মতার প্রতীক হিসেবেও ।
পাশাপাশি নদী রবীন্দ্রসঙ্গীতে এসেছে গভীর অনুভবের মাধ্যম হিসেবে।
-বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা,
তুমি বাহিরে বাহিরে বয়ো,
আমি ভেতরে ভেতরে।
চলমান নদীর ধারা ঈশ্বরের অনন্ত প্রেরণার রূপ হিসেবে বর্ণনা পেয়েছে তাঁর লেখায় । অন্যদিকে নদী যেমন মিলনের সেতু, তেমনি নদী বর্ণিত হয়েছে বিচ্ছেদের প্রতীক হয়েও । নদী দুই তীরকে পৃথক করে রেখেছে। সেই পাড় ধরেই মানুষ চলে আপন ঠিকানায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস ও গল্পে নদী-প্রকৃতি নানা ধারায় প্রবাহিত হয়েছে। নৌকাডুবি, চোখের বালি, ঘরে বাইরে সহ কয়েকটি উপন্যাসে নদী নানাভাবে শোভা পেয়েছে। বিশ্বকবির দৃষ্টিভঙ্গিতে নদী-প্রকৃতি শুধুমাত্র প্রকৃতির দৃশ্য নয়। এক আত্মিক ও দর্শনীয় উপাদান। যা মানবজীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে। কবির নদী-প্রেম কাব্যিক, দার্শনিক ও সৃজনশীলতায় ভরা।

